আসাদুজ্জামান বাবুল: বিসিএস (পাবলিক ওয়ার্কস) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের মেধাতালিকার প্রথম স্থানে থাকা আশরাফুল আলমকে প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে সরিয়ে ছয়জনকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব নেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া, নিজের গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটে টেন্ডার, নিয়োগ ও পোস্টিং বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। মনে হয়, এক পীরে সবাই বশ।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রীদের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে প্রভাব বিস্তার করে মেধাতালিকায় ৭ নম্বরে থাকার পরও প্রধান প্রকৌশলী পদে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর চলতি দায়িত্ব পান শামীম আখতার। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ (গ্রেড-১) এই পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ছয় মাসের বেশি কাউকে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা যাবে না। অথচ বিসিএস (পাবলিক ওয়ার্কস) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের মেধাতালিকার প্রথম স্থানে থাকা আশরাফুল আলমের বাড়ি বগুড়া হওয়ার কারণে প্রধান প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক মাস পরেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে ছয়জনকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব নেন শামীম আখতার। তিনি বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে বিসিএস (গণপূর্ত) ১৫ ব্যাচের প্রথম ব্যক্তিকে হটিয়ে এই পদে আসীন হবার পর হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য।
সিন্ডিকেট গড়ে তুলে টেন্ডার, নিয়োগ ও পোস্টিং বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার নিজেকে পীরের বংশধর পরিচয় দিয়ে থাকেন। এমনকি নারায়ণগঞ্জের ভুঁইগড়ে গড়ে তুলেছেন হাকিমাবাদ খানকা-ই- মোজাদ্দেদিয়া। যার পীর হিসেবে রয়েছেন তিনি নিজেই আল্লামা হযরত মোহাম্মদ শামীম আখতার (মোদ্দাজিল্লুহুল আলিয়াহ)। পীরের মুরিদরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ঠিকাদারও বটে। তারা বড় বড় সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করছেন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মের বাইরে গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন তারা। গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর পদে আসার আগে শামীম ছিলেন হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) মহাপরিচালক। সেখানে কখনও কখনও প্রকল্প পাস না করে, কখনও টেন্ডার হওয়ার আগেই কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়ে যান তার মুরিদ ঠিকাদাররা। মাসে লাখ টাকা বেতনে প্রকল্পের পরামর্শক, কর্মকর্তা-প্রকৌশলী থেকে বাবুর্চি-মালীর মতো পদগুলোয়ও নিয়োগ দেওয়া হয় মুরিদদের। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ জমা পড়েছিল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। পরে অতিরিক্ত সচিব ড. আশফাকুল ইসলাম বাবুলকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরে তা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন শামীম আখতার।
তিনি গণপূর্তে যোগদার করার পরপরই গণপূর্তের প্রশিক্ষণ একাডেমি, একটি পূর্ত ভবনের উন্নয়ন, প্রধান প্রকৌশলীর বাসভবন সংস্কারসহ একাধিক প্রকল্পের কাজ পেতে শুরু করেন শামীমের মুরিদরা। এ নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে ঠিকাদারদের মতবিনিময় সভায় দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঠিকাদাররা।
এর আগে তিনি হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক থাকাকালীন তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংডম বিল্ডার্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে কার্যাদেশ দেওয়াসহ কোটি কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মনিটরিং) মো. আশফাকুল ইসলাম বাবুলকে আহ্বায়ক করে দুজন যুগ্ম সচিবকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি অভিযোগগুলোর মধ্যে তিনটি অভিযোগের প্রমাণ পায়। প্রায় এক বছর আগে তদন্ত প্রতিবেদন সচিবের কাছে জমা দিলেও প্রধান প্রকৌশলী তদন্ত প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এইচবিআরআইয়ের গবেষণা খাতে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। গবেষণা খাতের এ টাকা থেকে ১ কোটি ১১ লাখ টাকায় ‘অটোমেটিক ব্লক মেকিং প্লান্ট’ স্থাপন করা হয়। এ কাজও পায় কিংডম বিল্ডার্স। ঠিকাদারকে সব বিল পরিশোধ করা হলেও প্লান্টটির কাজ অসমাপ্ত থাকে। এ ধরনের কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রকৌশলীদের নিয়ে কমিটি গঠনের নিয়ম থাকলেও সে ধরনের কোনো কমিটিই হয়নি।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও প্লান্টটি সম্পূর্ণরূপে চালু অবস্থায় বুঝে না পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরাবরে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো কারিগরি কমিটি কর্তৃক বাস্তবায়ন প্রতিবেদন নেয়নি। সার্বিক পর্যালোচনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ফাংশনাল অবস্থায় বুঝিয়ে না দেওয়া সত্ত্বেও ওই প্রকল্পটির সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। অর্থাৎ প্রকল্পটির টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম না হলেও বিল পরিশোধে নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে। তা ছাড়া শামীম আখতারের বদলির পর পরবর্তীতে বর্ণিত প্লান্টটির বিষয়ে কোনো কার্যক্রমই গ্রহণ করা না হওয়ায় প্লান্টটির মেশিনারিজ অযত্নে অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় প্লান্টটির ক্ষতি হচ্ছে মর্মে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্লান্টের শেড নির্মাণের জন্য ৭০ লাখ টাকার কাজে কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই কিংডম বিল্ডার্সকে নিযুক্ত করা হয়। অর্ধকোটি টাকার কাজ আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অর্থি এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয় যার মালিক আল আমীনও শামীম আখতারের মুরিদ।
ই-জিপির উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ৭০ লাখ টাকার প্রকল্পটির টেন্ডার করা হয়। তবে প্রকল্পটি ২০১৯ সালের হলেও নথিতে রক্ষিত চুক্তিপত্রটি ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছে মর্মে দেখা যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, চুক্তিপত্রটি যথাসময়ে স্বাক্ষর না করে পরবর্তীতে করা হয়েছে। অর্থাৎ ওই প্রকল্পটি চুক্তি স্বাক্ষর না করেই বাস্তবায়ন শুরু করা হয়েছে। তা ছাড়া অভিযোগে বর্ণিত অর্ধকোটি টাকার আরেকটি কাজের তথ্য বিশ্লেষণে মনে হয় এটি একটি পৃথক কাজ। সুতরাং অভিযোগে উল্লিখিত ৭০ লাখ টাকার প্রকল্পটির চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় করা হয়েছে বলে কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয়েছে।
চতুর্থ অভিযোগের বিবরণে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনিক ২০ ঘনমিটার ব্লক উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্যে ‘এএসি প্লান্ট’ উন্নয়নকাজে ২০১৯ সালে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। কাজটি করে কিংডম বিল্ডার্স, অর্থি এন্টারপ্রাইজ ও জামান বিল্ডার্স। ঠিকাদারদের সিংহভাগ বিল দেওয়া হলেও এখানেও চালু হয়নি প্লান্টটি, উল্টো কাজ শেষ করতে আরও সাড়ে ৩ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে তারা। অভিযোগের বিষয়ে শামীম আখতারের বক্তব্য, তার দাখিলকৃত কাগজপত্র এবং সংরক্ষিত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় বিল প্রদানের ক্ষেত্রে প্রথা অনুযায়ী এমবি (মেজারমেন্ট বুক) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কারিগরি যন্ত্রপাতি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির গুণগত মান নিশ্চিত না হয়েই প্রায় ৯০ শতাংশ বিল প্রদান করায় নিয়মের ব্যত্যয় করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া একই মাসে প্রায় ১ কোটি টাকার এইচবিআরআইয়ে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ পায় তার মুরিদের প্রতিষ্ঠান কিংডম বিল্ডার্স। চুক্তির চেয়ে ঠিকাদারদের ৮ লাখ টাকা বেশি বিল দেওয়া হলেও কাজটি থেকে যে অন্যদিকে দরপত্রের আগেই অফিস সংস্কারের কাজ শুরু করে দেয় অর্থি এন্টারপ্রাইজ। এত বড় বড় দুর্নীতি করার পরও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে।
অন্যদিকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনের ফলে পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা চিহ্নিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী,এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের কোন প্রকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় গণপূর্ত অধিদফতরের দীর্ঘদিন যাবত প্রচলিত সিন্ডিকেট মুক্ত হয়নি। এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে কোন নিয়ম কানুনকে তারা তোয়াক্কা করছে না। এরা সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব সহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের নাম ব্যবহার করে এরা ফায়দা হাসিল করেছে দীর্ঘদিন যাবত। আবার সরকার পতনের তারাই রাজত্ব করে যাচ্ছে। এখনো শামীম সিন্ডিকেট দুর্দান্ত প্রতাপে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের বেপরোয়া অনৈতিক কর্মকান্ড।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার তার ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এর বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মানের ক্ষেত্রে। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সাইট সিলেকশনের অজুহাত দেখিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর অন্যতম সিন্ডিকেট মেম্বার গণপূর্ত বিভাগ-১ নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামকে দিয়ে একটি কমিটি বানিয়ে কাজটি হস্তান্তর করেন। ওই কাজ মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগ থেকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ হস্তান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কয়েক কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হাতিয়ে নেয়া। তিনিই প্রধান প্রকৌশলীর ডাটাবেজ তৈরির কাজে সহযোগিতা করছেন। প্রধান প্রকৌশলীর অন্যতম সিন্ডিকেট মেম্বার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতীনাথ বসাক অসংখ্য দুর্নীতি ও অপরাধ করেও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তিনি সুফিবাদ মতাদর্শের অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাছাড়া,তিনি নারায়ণগঞ্জের ভুঁইগড়ের হাকিমাবাদ খানকা-ই-মোজাদ্দেদিয়ার ‘পীর সাহেব’। পীর হিসেবে তার নাম আল্লামা হযরত মোহাম্মদ শামীম আখতার (মোদ্দাজিল্লুহুল আলিয়াহ)। কম্বোডিয়াসহ বাংলাদেশের কয়েকটি স্থানে রয়েছে এ খানকার শাখা। পীরের মুরিদরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ঠিকাদারও বটে। তারা বড় বড় সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মের বাইরে গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন তারা। গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর পদে আসার আগে শামীম ছিলেন হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) মহাপরিচালক। সেখানে কখনও কখনও প্রকল্প পাস না করে, কখনও টেন্ডার হওয়ার আগেই কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়ে যেতেন তার মুরিদ ঠিকাদাররা। মাসে লাখ টাকা বেতনে প্রকল্পের পরামর্শক, কর্মকর্তা-প্রকৌশলী থেকে বাবুর্চি-মালীর মতো পদগুলোয়ও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল মুরিদদের। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তখন জমা পড়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।রহস্যজনক কারনে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ অধিকাংশ নির্বাহী প্রকৌশলী দরপত্র আহ্বান সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিদপ্তরের অধিকাংশ অতিরিক্ত, তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাহী প্রকৌশলী পিপিআর ও জিএফআর লঙ্ঘন করেছেন ঢালাওভাবে। মানেননি মন্ত্রী পরিষদের নির্দেশনা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর ও মূসক নির্দেশনাও। লঙ্ঘন করেছেন ট্রেজারি রুলের সাবসিডিয়ারি রুল (এসআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অনুবিভাগ এর নির্দেশনা। পাশাপাশি সিপিডব্লিউ ‘এ’ এবং সাব ডেলিগেশনও লঙ্ঘন করেছেন। মানেননি ইজারার সাধারণ শর্তাবলীও। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) ভেঙে করেছেন লিমিটেড টেন্ডার মেথড (এলটিএম)। এধরনের স্বেচ্ছাচারিতা এখনো অব্যাহত রেখেছেন গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আকতার এন্ড সিন্ডিকেট।
অন্যদিকে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আকতার (স্বঘোষিত পীর) গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নিজের আস্তানা বানিয়েছেন। অনিয়মের সাথে জড়িত এসব প্রকৌশলীর একটি অংশ তার মুরিদ হয়েছেন। এর বাইরে ঠিকাদারের একটি গ্রুপ রয়েছেÑ যারা তার মুরিদ। মুরিদ হলেÑ অনিয়ম করে পার পাওয়া যায়। ঠিকাদারি করলে দরপত্রের কাজ পাওয়া সহজ হয়। পীরের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের কেউ কথা বললে তার বদলী আদেশের চিঠি চলে আসে। এই ভয়ে অনেকে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না । ঠিকাদার মুরিদ এবং কিছু মুরিদ কর্মকর্তা নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে অধিদপ্তরে রাজত্ব করছেন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আকতার। তার নেতৃত্বেই চলছে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি।
প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার ও তার দুর্নীতির সিন্ডিকেট মেম্বার-অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: কায়কোবাদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতীনাথ বসাক, নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান ওরফে ডিপ্লোমা মাহবুব, নির্বাহী প্রকৌশলী মো: কায়সার ইবনে সাঈখ, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউসুফ, নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাস গং অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে বাড়ি, প্লট, ফ্লাট, গাড়িসহ প্রচুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। যা তাদের জ্ঞাত আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। উপরোক্ত সকলের নিজ ও পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয় পত্রের বিপরীতে সম্পদের অনুসন্ধান করলে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে জানা যায়।
বৈষম্যেবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ‘রাষ্ট্র’ সংস্কার কার্যক্রমের শুরু হয়েছে। যা-বর্তমানেও চালু রয়েছে। সেক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিপ্তর ও পরিদপ্তরসহ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর ও সমর্থিত কর্মকর্তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হচ্ছে। তবে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের চিত্র ভিন্ন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর ও সমর্থিত প্রকৌশলী এবং অন্য কর্মকর্তরা অধিদপ্তরটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এখনো আছেন বহাল তবিয়তে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছেÑএক পীরে সবাই বশ।
এবিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্যে প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের মোবাইল ফোনে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। (পর্ব-১)