সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি যেন পুরোনো খবর হয়ে গেছে। বাস্তবতায় বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের চোখে মুখে শুধুই হতাশা। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে বাড়তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর ক্রেতারা চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছেন দামের চাপে।
প্রতিদিনই বাজার করতে গিয়ে খেটে-খাওয়া মানুষ পড়ছেন বিপাকে। গরু ও মুরগির মাংসের দাম সহসাই কমার কোনো ইঙ্গিত নেই, আবার মাছের বাজারেও যেন লেগেছে আগুন। এদিকে গরু ও খাসির দাম স্থির থাকলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের পকেটে চাপ বাড়ছে।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
বাজারে বেগুনের কেজি প্রকারভেদে ৮০ থেকে ১৪০ টাকা, বরবটি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পটল ৮০ থেকে ১২০ টাকা, ধুন্দল ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুর মুখী ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ঝিঙের কেজি ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রকারভেদে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা এবং পেঁপে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে করলার কেজি ১০০ থেকে ১৪০ টাকা।
প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। টমেটোর কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, ইন্ডিয়ান গাজর ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ৮০ টাকা।
লেবুর হালি ১৫ থেকে ৩০ টাকা, ধনে পাতার কেজি ৪০০ টাকা, কাঁচা কলার হালি ৫০ টাকা, চাল কুমড়া ৬০ টাকা পিস, ক্যাপসিকাম ৪০০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা, মুলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা ও মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা।
বাজারে লাল শাকের আঁটি ২৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কলমি শাক ১৫ টাকা, পুঁই শাক ৪০ টাকা এবং ডাঁটা শাকের আঁটি ২৫ টাকা। এ সব বাজারে আলুর কেজি ২৫ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৮৫ টাকা।
দেশি আদার কেজি ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, চায়না আদা ২৬০ টাকা, রসুন দেশি ১০০ টাকা এবং ইন্ডিয়ান রসুন ১৪০ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা, মুগ ডাল ১৮০ টাকা, ছোলা ১১০ টাকা ও খেসারির ডাল ১৩০ টাকা।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাজধানীর শান্তিনগর বাজারে বাজার করতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মাসুদ রানা। সবজির দাম বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সবজির যে দাম এতে করে আধা কেজি বা আড়াই’শ গ্রাম করে সবজি কিনতে হচ্ছে। আমাদের মত সাধারণ ক্রেতারা কীভাবে সবজি কিনে খাবে? তারপরেও যেহেতু সবজি ছাড়া উপায় নেই সে কারণে বাধ্য হয়ে কোনো সবজি আড়াই’শ গ্রাম, কোনোটা আধা কেজি এভাবে কিনতে হচ্ছে আমাদের মত ক্রেতাদের।
বিক্রেতারা দাবি করছেন, পাইকারি বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি ও সরবরাহ সংকট এর জন্য দায়ী। আর ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো তদারকি নেই, সিন্ডিকেট ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে।
রামপুরা বাজারের সবজি বিক্রেতা সানাউল হক বলেন, বাজারে সবজির দাম বাড়তিই যাচ্ছে। দাম বাড়তি থাকায় আমাদের ব্যবসায় ধস নেমেছে। ক্রেতারা এখন আর বেশি সবজি কিনছে না।আগে যেখানে এক আইটেম সবজি ১৫-২০ কেজি করে আনতাম, এখন সেসব সবজিই ৪-৫ কেজি করে এনেও বিক্রি করতে পারছি না। সবজির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতাদের মতো আমরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।
সোনালি কক মুরগির কেজি ৩৩০ টাকা এবং সোনালি হাইব্রিড মুরগি ৩১০ টাকা। লাল লেয়ার মুরগি ৩১০ টাকা, সাদা লেয়ার ৩০০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৬০ থেকে ৬৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে এক ডজন লাল ডিম ১৫০ টাকা, হাঁসের ডিম ২১০ টাকায়, দেশি মুরগির ডিমের হালি ১১০ টাকা এবং সোনালি কক মুরগির ডিমের হালি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে গরুর মাংসের কেজি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা, গরুর কলিজা ৮০০ টাকা, গরুর মাথার মাংস ৪৫০ টাকা, গরুর বট ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং খাসির মাংসের কেজি এক হাজার ২০০ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক মাসে মুরগি ও মাছের দামে ২০–৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে, অথচ গরু-খাসির দাম স্থির থাকলেও সেটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাজারে বিক্রেতারা যেখানে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন, সেখানে ক্রেতারা বলছেন—যতদিন পর্যন্ত কার্যকর বাজার তদারকি না হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।
বাজারে গিয়ে ভোক্তাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। শুধু কাগজে-কলমে সিন্ডিকেট ভাঙার ঘোষণা দিয়ে কি মানুষকে বাজার থেকে স্বস্তি দেওয়া যায়?’
গত সপ্তাহের চেয়ে কেজিতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে ইলিশ মাছের দাম। আকারভেদে ইলিশের কেজি ৭৫০ টাকা থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা।
বাজারে অন্যান্য মাছের দাম বেড়েছে। চাষের শিংয়ের কেজি আকারভেদে ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, দেশি শিং এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। প্রতি কেজি রুই মাছের দাম বেড়ে (আকারভেদে) ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেশি মাগুর মাছের কেজি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা, মৃগেল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, চাষের পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা, বোয়াল ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।
বড় কাতলের কেজি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, পোয়া ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ টাকা, কই ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, মলা ৫০০ টাকা, বাতাসি টেংরা এক হাজার ৩০০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, কাচকি ৫০০ টাকা এবং পাঁচ মিশালি ২২০ টাকা।
গৃহিণী রোকেয়া বেগম নামক এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘক্ষণ বাজারে ঘুরছি, কিন্তু পছন্দের মাছ কিনতে পারছি না। যে মাছ পছন্দ হয়, সেটির দাম বেশি, আবার যেগুলোর দাম কম, সেটগুলোর মান ভালো না।
মাছ বিক্রেতা জামাল মিয়া বলেন, “বর্ষার কারণে নদীতে মাছ কম ধরা পড়ছে, খামারিদের খরচও বেড়েছে। এজন্যই দাম বাড়ছে। আমাদেরও কিছু করার নেই।”
মুরগির বাজারের দোকানি হানিফ মিয়া বলেন, “খাদ্য ও ভাড়ার খরচ বেড়েছে, তাই ফার্মের মুরগির দাম কমার সম্ভাবনা নেই।”
বনশ্রী কাঁচাবাজারের কসাই শহীদুল ইসলাম বলেন, “গরু-ছাগলের সরবরাহ ঠিক আছে, তাই দামও স্থির রয়েছে। তবে গরুর মাংসের বর্তমান দাম অনেক ক্রেতার জন্যই বেশি।”