পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ঢাকায় আসার সম্ভাবনায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস। অক্টোবরে বাংলাদেশের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে আগ্রহ দেখিয়েছে ব্রাজিল। কিন্তু মাঠে বল গড়ানোর আগেই প্রস্তাবিত এই ম্যাচ ঘিরে সামনে এসেছে বড় দুটি প্রশ্ন-খরচের ভার কে নেবে এবং এত বড় ম্যাচ খেলার মতো প্রস্তুত থাকবে তো বাংলাদেশ?
ব্রাজিলের সফর আয়োজন করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সেই ব্যয় মেটাতে সরকারের সহযোগিতা চাইতে পারে-এমন আভাস এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত অর্থ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ব্রাজিলের সফর নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখুন, এক কথায় উত্তর দিলে এই মুহূর্তে আমরা সরকারে পক্ষ থেকে এ ধরনের অর্থ ব্যয় করে…যেহেতু আপনারা জানেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে আমাদের অনেক বেশি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে একটি ম্যাচকে উপলক্ষ করে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের ব্যয় করার মতো মানসিকতা আমাদের ভেতরে নেই।’
ব্রাজিলকে ঢাকায় দেখতে সরকারের আপত্তি নেই, আপত্তি আছে সরকারি অর্থে সেই আয়োজনের খরচ বহনে। তবে বাফুফে যদি বেসরকারি খাতের স্পনসরদের যুক্ত করতে পারে, তাহলে সরকারের সহযোগিতার দরজা খোলা থাকবে।
আমিনুল হক বলেন, ‘বাফুফের সঙ্গে যেহেতু কথা হয়েছে (ব্রাজিল প্রতিনিধিদলের), তারা যদি বিভিন্ন স্পনসর এনে সেটাকে পরিপূর্ণতা দিতে পারে, তাহলে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করব।’
এতেই অবশ্য ব্রাজিলের ঢাকা সফর নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টিই এখনো প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে। বাফুফে সভাপতি ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হলেও অর্থের পরিমাণ কিংবা আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আরও জানালেন, ‘বিষয়টা একদম প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বাফুফের সভাপতির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমরা প্রাথমিক আলোচনাই করেছি। ব্যয়ভার বহনসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে এখনো খোলামেলা আলোচনা হয়নি।’
আরও পরিষ্কার করে তিনি বলেছেন, ‘এটা একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এখনো বিশদভাবে আলোচনা হয়নি। আদৌ ব্রাজিল দল বাংলাদেশে আসবে কি না, সেটা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই।’
তবে শুধু অর্থের অঙ্কই নয়, সম্ভাব্য ম্যাচের সময়সূচিও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ব্রাজিলের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আন্তর্জাতিক সূচি বেশ ব্যস্ত। ২৫ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ায় দুটি প্রীতি ম্যাচের পর ৩ অক্টোবর কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে খেলার কথা রয়েছে তাদের। এরপর ৬ অক্টোবর ফিফা আন্তর্জাতিক উইন্ডোর শেষ দিনে ঢাকায় বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ব্রাজিলের দিক থেকে সূচিটা যথেষ্ট বাস্তবসম্মত। অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারত, এরপর কলকাতা থেকে ঢাকা-ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি এই রুটে সফর সাজালে অতিরিক্ত ভ্রমণের ঝামেলাও কমে। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ম্যাচ খেলে পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়া ব্রাজিলের জন্য তাই খুব অসম্ভব কোনো পরিকল্পনা নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারেই লুকিয়ে আছে বড় সমস্যা।
ঠিক ওই সময় বাংলাদেশ খেলবে ফিফা আসিয়ান কাপে। ইন্দোনেশিয়ায় ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অন্তত চারটি ম্যাচ খেলার কথা। অর্থাৎ ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার মাঠে থাকার পর দেশে ফিরে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে মাঠে নামতে হতে পারে বাংলাদেশকে।
এখানেই প্রীতি ম্যাচটির রোমাঞ্চের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত। একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে একাধিক ম্যাচ খেলার পর দীর্ঘ ভ্রমণ করে দেশে ফিরে মাত্র দুই দিনের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠে নামা খেলোয়াড়দের জন্য শারীরিকভাবে কতটা কঠিন হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিষয়টি শুধু ক্লান্তির নয়, সূচি ব্যবস্থাপনারও। ফিফা আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে ম্যাচসংখ্যা নিয়েও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আসিয়ান কাপের সূচি এবং ব্রাজিল ম্যাচ—দুটিকে একই উইন্ডোর মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আর এখানেই ব্রাজিলের আগ্রহের পাশাপাশি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়ছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে খেলার সুযোগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের। কিন্তু একটি ম্যাচ আয়োজনের অর্থনৈতিক ব্যয়, জাতীয় দলের প্রস্তুতি এবং খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা—সবকিছুর হিসাব মিলিয়েই শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ব্রাজিল বাংলাদেশে এলে দেশের ফুটবলের কতটা লাভ হবে, সেই প্রশ্নেও অবশ্য খুব বড় প্রত্যাশা দেখাচ্ছেন না ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, ম্যাচটি দর্শকদের আনন্দ দিতে পারে, বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জনও হতে পারে; কিন্তু শুধু ব্রাজিলের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেললেই দেশের ফুটবলে বড় পরিবর্তন আসবে-এমনটা তিনি মনে করেন না।
স্পনসর নিয়ে ব্রাজিল ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ খোলা থাকবে বাফুফের সামনে। জানা গেছে, থার্ড পার্টি থেকে অনেকেই বলেছে, ম্যাচটা আয়োজনে ৩ মিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। এতো টাকা খরচ করতে রাজি নয় বাংলাদেশ!
আমিনুল হক বলেন, ‘আমরা যেটা বিশ্বাস করি, ব্রাজিল টিম যদি বাংলাদেশে আসে, এসে যদি আবার বাংলাদেশ টিমের সঙ্গে খেলে, তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট। কিন্তু আমার বাংলাদেশের ফুটবল কতটুকু এগোবে এর মাধ্যমে, এটা নিয়ে আমি খুব বেশি আশাবাদী নই এ কারণে, ম্যাচ হবে, হয়তোবা বাংলাদেশ ব্রাজিলের সঙ্গে খেলবে, মানুষের যে প্রত্যাশা, সেটা হয়তোবা পূরণ হবে। দর্শকেরা হয়তোবা একটু আনন্দিত হবেন, কিন্তু ব্রাজিল টিম খেলে গেলে যে বাংলাদেশের ফুটবলে পরিবর্তন আসবে-এ বিষয়ের সঙ্গে আমি একমত নই।’
তাই আপাতত ব্রাজিলের ঢাকায় আসার গল্পটি সম্ভাবনার গল্পই। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আগ্রহ, অন্যদিকে আয়োজনের বিশাল ব্যয়; একদিকে স্পনসর পাওয়ার সম্ভাবনা, অন্যদিকে জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচি। সব হিসাব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত যদি ম্যাচটি হয়, সেটি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন হতে পারে। তবে তার আগে বাফুফেকে মাঠের বাইরের অঙ্কটাই মেলাতে হবে!